মাথা ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, শরীরের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা ঘন ঘন খিঁচুনি—এই লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ব্রেন টিউমারের মতো মারাত্মক রোগ। ব্রেন টিউমার বা মস্তিষ্কের টিউমার বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক জটিল ও ভয়ের চিত্র। অতীতে এই চিকিৎসার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও, বর্তমানে বাংলাদেশে অত্যন্ত সফলভাবে বিশ্বমানের ব্রেন টিউমার অপারেশন সম্পন্ন হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ এ ভালো ব্রেন টিউমার অপারেশন কে করেন? এবং দেশের কোথায় পাবেন এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা? এই বিশদ আর্টিকেলটিতে আমরা দেশের শীর্ষস্থানীয় নিউরোসার্জানদের পরিচিতি, তাদের কর্মস্থল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ব্রেন টিউমার সার্জারি সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরছি।
বাংলাদেশ এ ভালো ব্রেন টিউমার অপারেশন করেন যারা (শীर्षস্থানীয় নিউরোসার্জানগণ)
বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে ব্রেন ও স্পাইন সার্জারিতে কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্র রয়েছেন, যারা নিজেদের দক্ষতা ও সাফল্যের মাধ্যমে রোগীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। নিচে তাদের বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
১. ডাঃ মোঃ রোকিবুল ইসলাম (রকিব)
- পদবী ও যোগ্যতা: এমবিবিএস (ডিএমসি), এমএস (নিউরোসার্জারি), এফএসিএস (ইউএসএ); ফেলো এন্ডোভাসকুলার নিউরোসার্জারি অ্যান্ড স্ট্রোক (মুম্বাই); আধুনিক নিউরোসার্জারিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (জাপান ও তুরস্ক)।
- বর্তমান কর্মস্থল: সহকারী অধ্যাপক, নিউরোসার্জারি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU)।
- বিশেষত্ব: তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ ও আধুনিক নিউরোসার্জার। ব্রেন টিউমার সার্জারি, মাইক্রোস্কোপিক ও এন্ডোস্কোপিক ব্রেন সার্জারি, স্পাইন সার্জারি এবং স্ট্রোক ও এন্ডোভাসকুলার চিকিৎসায় তার বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে। জটিল সব ব্রেন টিউমার নিখুঁতভাবে অপারেশনে তার সাফল্য দেশজুড়ে প্রশংসিত।
- চেম্বার ও সিরিয়াল: পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি (বাড়ি ১৬, রোড ২, ধানমন্ডি আর/এ, ঢাকা)। রোগী দেখার সময়: সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা (শনি, রবি, মঙ্গল ও বুধবার)।
২. অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া
- পদবী ও যোগ্যতা: এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমএস (নিউরোসার্জারি), পিএইচডি, এফআইসিএস।
- বিশেষত্ব: দেশের নিউরোসার্জারি অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃত এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। জটিল ব্রেন টিউমার ও খুলিভিত্তি (Skull Base) সার্জারিতে তাঁর সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
- চেম্বার/হাসপাতাল: ধানমন্ডি পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল।
৩. অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন
- পদবী ও যোগ্যতা: এমবিবিএস, এমএস (নিউরোসার্জারি), এফআইসিএস।
- বিশেষত্ব: ব্রেন এবং স্পাইনাল কর্ডের টিউমার অপসারণে মাইক্রোসার্জারির ক্ষেত্রে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ।
- চেম্বার/হাসপাতাল: ঢাকা ও এর স্বনামধন্য বিভিন্ন হসপিটাল।
৪. অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ
- পদবী ও যোগ্যতা: এমবিবিএস, এমএস (নিউরোসার্জারি), পিএইচডি।
- বিশেষত্ব: ব্রেন টিউমার, নার্ভ ও স্ট্রোক সার্জারিতে অত্যন্ত অভিজ্ঞ একজন ক্লিনিশিয়ান ও সার্জন।
- চেম্বার/হাসপাতাল: ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বিভিন্ন প্রাইভেট ইনস্টিটিউট।
ব্রেন টিউমার অপারেশনের জন্য ঢাকার সেরা হাসপাতালসমূহ
একজন দক্ষ সার্জনের পাশাপাশি একটি সফল অপারেশনের জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ সুবিধা। বাংলাদেশের যেসকল হাসপাতালে নিয়মিত ও সফলভাবে ব্রেন টিউমার অপারেশন হয়:
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU): দেশের প্রধান এই চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত কম খরচে দেশের সেরা অধ্যাপকদের তত্ত্বাবধানে ব্রেন টিউমার অপারেশন করা হয়।
- ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল (NINS): আগারগাঁওয়ে অবস্থিত এই বিশেষায়িত সরকারি ইনস্টিটিউটে ব্রেন ও স্নায়ুরোগের জন্য সর্বাধুনিক চিকিৎসা ও ডেডিকেটেড নিউরো-আইসিইউ রয়েছে।
- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (DMCH): এখানে প্রতিদিন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও জটিল নিউরোসার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন করেন দেশের নামকরা সার্জনরা।
- পপুলার ডায়াগনস্টিক ও প্রাইভেট হসপিটালসমূহ: ধানমন্ডি ও রাজধানীর অন্যান্য নামী বেসরকারি হাসপাতালে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রফেসর ও সহকারী অধ্যাপকরা নিয়মিত রোগী দেখছেন এবং আধুনিক কর্পোরেট হাসপাতালে সার্জারি সম্পন্ন করছেন।
ব্রেন টিউমার অপারপুরে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি
অতীতে ব্রেন সার্জারি মানেই বড় ধরণের কাটাছেঁড়া ও উচ্চ ঝুঁকি বোঝাতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই অপারেশন অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে:
- নিউরো-নেভিগেশন (Neuro-Navigation): এটি সার্জারির সময় মস্তিষ্কের ভেতরের থ্রি-ডি (3D) ম্যাপ তৈরি করে, যার ফলে সার্জন বুঝতে পারেন টিউমারের সঠিক সীমানা কোথায় এবং সুস্থ ব্রেন টিস্যু অক্ষত রেখে কীভাবে টিউমার কাটতে হবে।
- অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ (Operating Microscope): এর মাধ্যমে উচ্চ মাত্রার আলো ও বিবর্ধন ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম রক্তনালী ও স্নায়ু বাঁচিয়ে টিউমার ফেলে দেওয়া সম্ভব হয়।
- নিউরো-এন্ডোস্কোপি (Neuro-Endoscopy): মাথার খুলি বড় করে না কেটে, ছোট ছিদ্র বা নাকের মাধ্যমে এন্ডোস্কোপ ঢুকিয়ে টিউমার অপারেশন করার অত্যাধুনিক পদ্ধতি।
ব্রেন টিউমার অপারেশনের খরচ কেমন হয়?
বাংলাদেশের ব্রেন টিউমার অপারেশনের খরচ মূলত নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, টিউমারের ধরন এবং হাসপাতাল নির্বাচনের ওপর:
- সরকারি হাসপাতাল: সরকারি মেডিকেল কলেজ ও নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে অপারেশন খরচ নামমাত্র বা প্রায় ফ্রি বললেই চলে (শুধুমাত্র কিছু ওষুধ ও ইমপ্লান্টের খরচ বাদে)। তবে এখানে চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে বা অপারেশনের তারিখ পেতে কিছুটা অপেক্ষা করতে হতে পারে।
- বেসরকারি হাসপাতাল: বেসরকারি ক্লিনিক বা করোরেট হাসপাতালে কেবিন ভাড়া, সার্জন ফি, এনেস্থেসিয়া এবং আধুনিক টেকনোলজি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
অপারেশন পরবর্তী জীবন ও সতর্কতা
ব্রেন টিউমার অপারেশন সফল হওয়ার পর রোগীর পূর্ণ সুস্থতার জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি:
- নিয়মিত ফলোআপ: সার্জনের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর ডাক্তার দেখানো এবং এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করানো।
- ওষুধ ও থেরাপি: চিকিৎসকের দেওয়া খিঁচুনিরোধী ওষুধ বা অন্যান্য প্রেসক্রিপশন নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া। প্রয়োজনে ফিজিক্যাল বা স্পিচ থেরাপি নেওয়া।
- মানসিক ও শারীরিক যত্ন: রোগীকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, টেনশনমুক্ত রাখা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার
“বাংলাদেশ এ ভালো ব্রেন টিউমার অপারেশন কে করেন?”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আপনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিউরোসার্জন যেমন ডাঃ মোঃ রোকিবুল ইসলাম (রকিব)-সহ অন্যান্য অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে পারেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং একজন দক্ষ সার্জনের নিখুঁত পরিশ্রমে ব্রেন টিউমার জয় করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্পূর্ণ সম্ভব। কোনো লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ নিউরোসার্জানের শরণাপন্ন হোন।
