ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাত বা পা অবশ হয়ে যাওয়া, ঝিঁঝিঁ ধরা বা “পিঁন ফোটানোর” মতো অনুভূতি হওয়া একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে Paresthesia (প্যারেসথেসিয়া) বলা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি সাময়িক হলেও, কারো কারো জন্য এটি নিয়মিত বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজন ভালো নিউরোলজিস্ট বা নিউরোসার্জণ দেখলে আপনি ভালো সমাধান পাবেন।
ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ হাত নাড়াতে না পারা বা পায়ে সাড় না পাওয়া বেশ আতঙ্কজনক হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর পেছনে সাধারণ কিছু কারণ থাকে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. শোয়ার ভুল ভঙ্গি (Sleeping Posture)
এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ। ঘুমের ঘোরে আমরা যখন হাতের ওপর মাথা রেখে শুই বা হাত শরীরের নিচে চাপা পড়ে থাকে, তখন রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয় এবং স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে। ফলে সাময়িকভাবে ওই অংশটি অবশ হয়ে যায়।
২. নার্ভ কম্প্রেশন বা স্নায়ুতে চাপ
আমাদের শরীরে অসংখ্য স্নায়ু জালের মতো ছড়িয়ে আছে। ঘুমের সময় বিশেষ কিছু স্নায়ুতে চাপ পড়লে অবশ ভাব হয়:
- আলনার নার্ভ (Ulnar Nerve): কনুইয়ের ওপর চাপ পড়লে হাতের কনিষ্ঠা এবং অনামিকা আঙুল অবশ হয়ে যায়।
- রেডিয়াল নার্ভ (Radial Nerve): বাহুর ওপর চাপ পড়লে হাতের কব্জি ও আঙুলে ঝিঁঝিঁ ধরে।
- মিডিয়ান নার্ভ (Median Nerve): এটি সাধারণত কব্জিতে চাপের কারণে হয়।
৩. ভিটামিনের অভাব
শরীরে ভিটামিন B12, B6, এবং E এর অভাব থাকলে স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে রাতে বা ঘুমের মধ্যে হাত-পা অবশ হওয়ার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিরামিষাশীদের মধ্যে ভিটামিন B12 এর ঘাটতি বেশি দেখা যায়।
৪. ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি (Diabetic Neuropathy)
যাঁদের দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস আছে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে নেই, তাঁদের পায়ের ও হাতের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এর ফলে রাতে ঘুমের মধ্যে হাত-পা জ্বালাপোড়া করা বা অবশ হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।
৫. কারপাল টানেল সিনড্রোম (Carpal Tunnel Syndrome)
যাঁরা হাতে অনেক বেশি কাজ করেন (যেমন: টাইপিং, সেলাই বা ভারি কাজ), তাঁদের কব্জির মিডিয়ান নার্ভটি সংকুচিত হয়ে যায়। এর প্রধান লক্ষণ হলো রাতে ঘুমের মধ্যে হাত অবশ হয়ে যাওয়া এবং ব্যথায় ঘুম ভেঙে যাওয়া।
৬. সার্ভাইকাল স্পন্ডিলোসিস (Cervical Spondylosis)
ঘাড়ের হাড়ের ক্ষয় বা ডিস্কের সমস্যার কারণে হাতের দিকে যাওয়া স্নায়ুগুলো সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে ঘাড় থেকে শুরু করে পুরো হাত বা আঙুল পর্যন্ত অবশ অনুভূত হতে পারে।
হাত-পা অবশ হওয়া রোধে করণীয় (প্রতিকার)
যদি আপনার এই সমস্যাটি নিয়মিত হয়, তবে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারেন:
| বিষয় | করণীয় |
| শোয়ার ভঙ্গি পরিবর্তন | হাতের ওপর মাথা রেখে শোয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। বালিশ যেন খুব বেশি উঁচু বা নিচু না হয়। |
| সুষম খাদ্য | খাবারে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স সমৃদ্ধ খাবার যেমন: ডিম, দুধ, মাছ এবং কলিজা রাখুন। |
| পর্যাপ্ত জল পান | ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার কারণে অনেক সময় পেশিতে টান পড়ে বা অবশ ভাব হয়। |
| হালকা স্ট্রেচিং | ঘুমানোর আগে হাত ও পায়ের আঙুলের হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে। |
| রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ | ডায়াবেটিস থাকলে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। |
কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি?
সাময়িক অবশ হওয়া ভয়ের কিছু নয়, তবে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:
- যদি প্রতিদিন ঘুমের মধ্যে বা ঘুম থেকে ওঠার পর হাত-পা অবশ থাকে।
- অবশ ভাবের সাথে যদি প্রচণ্ড ব্যথা বা দুর্বলতা অনুভব করেন।
- হাত দিয়ে কোনো কিছু ধরতে বা মুঠি করতে সমস্যা হলে।
- যদি শরীরের একপাশ (এক হাত এবং এক পা) অবশ হয়ে যায়।
- দৃষ্টিশক্তি ঘোলাটে হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার সাথে অবশ ভাব দেখা দিলে (এটি স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণ হতে পারে)।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা
ডাক্তার আপনার অবস্থা বুঝে নিচের পরীক্ষাগুলো দিতে পারেন:
- NCS (Nerve Conduction Study): স্নায়ু কতটা দ্রুত সংকেত পাঠাচ্ছে তা দেখার জন্য।
- MRI: ঘাড় বা পিঠের হাড়ের সমস্যা নিশ্চিত করতে।
- Blood Test: ভিটামিন লেভেল এবং সুগার চেক করার জন্য।
উপসংহার
ঘুমের মধ্যে হাত-পা অবশ হওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনার শোয়ার ধরনের ওপর নির্ভর করে। তবে এটি নিয়মিত হলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যার সংকেত হতে পারে। তাই অবহেলা না করে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
