ব্রেন টিউমার কত প্রকার? ধরন, গ্রেড এবং বিস্তারিত শ্রেণিবিভাগ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাইড

ব্রেন টিউমার কত প্রকার

মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের সবথেকে জটিল অঙ্গ। এই অঙ্গে যখন কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে, তখন তাকে আমরা “ব্রেন টিউমার” বলি। তবে সব ব্রেন টিউমার একরকম নয়। কোনোটি প্রাণঘাতী ক্যানসার, আবার কোনোটি খুব সাধারণ যা সঠিক চিকিৎসায় পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। “ব্রেন টিউমার কত প্রকার?”—এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কারণ টিউমারের প্রকারভেদের ওপরই নির্ভর করে এর চিকিৎসা এবং রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা।

২০২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, ব্রেন টিউমারের প্রকারভেদ, ধরন এবং গ্রেড নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. উৎপত্তিস্থল অনুযায়ী ব্রেন টিউমারের প্রকারভেদ

টিউমারটি মস্তিষ্কের ভেতরে তৈরি হয়েছে নাকি শরীরের অন্য অংশ থেকে এসেছে, তার ওপর ভিত্তি করে একে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

ক. প্রাইমারি ব্রেন টিউমার (Primary Brain Tumor)

যদি টিউমারটি সরাসরি মস্তিষ্কের ভেতরে বা এর আশেপাশের টিস্যু (যেমন: মস্তিষ্কের আবরণ বা নার্ভ) থেকে উৎপন্ন হয়, তবে তাকে প্রাইমারি ব্রেন টিউমার বলে। এটি আবার দুই ধরনের হতে পারে:

  • বিনাইন (Benign): ক্যানসারহীন টিউমার।
  • ম্যালিগন্যান্ট (Malignant): ক্যানসারযুক্ত টিউমার।

খ. সেকেন্ডারি বা মেটাস্ট্যাটিক টিউমার (Secondary/Metastatic Tumor)

শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের ক্যানসার (যেমন: ফুসফুস, স্তন বা কিডনি) যখন রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে সেকেন্ডারি ব্রেন টিউমার বলে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই ধরনের টিউমার বেশি দেখা যায়।


২. কোষের প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ

মস্তিষ্কের কোন ধরনের কোষ থেকে টিউমারটি তৈরি হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা একে কয়েক ভাগে ভাগ করেন:

১. গ্লিওমাস (Gliomas)

মস্তিষ্কের ‘গ্লিয়াল’ কোষ থেকে এই টিউমারের উৎপত্তি। এটি সবথেকে সাধারণ প্রাইমারি টিউমার। এর উপবিভাগগুলো হলো:

  • অ্যাস্ট্রোসাইটোমা (Astrocytoma): এটি মস্তিষ্কের যেকোনো অংশে হতে পারে।
  • অলিগোডেন্ড্রোগ্লিওমা (Oligodendroglioma): এটি সাধারণত মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল বা টেম্পোরাল লোবে হয়।
  • এপেনডাইমোমা (Ependymoma): এটি মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকল বা তরলপূর্ণ জায়গায় তৈরি হয়।

২. মেনিনজিওমা (Meningioma)

মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের চারপাশের আবরণ বা ঝিল্লি (Meninges) থেকে এই টিউমার তৈরি হয়। এর প্রায় ৯০ শতাংশই বিনাইন বা ক্যানসারহীন।

৩. পিটুইটারি অ্যাডেনোমা (Pituitary Adenoma)

মস্তিষ্কের নিচের দিকে থাকা পিটুইটারি গ্রন্থিতে এই টিউমার হয়। এটি সাধারণত ক্যানসার নয়, তবে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে চোখের দৃষ্টিতে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

৪. শ্যালোয়ানোমা (Schwannoma)

এটি সাধারণত শ্রবণ এবং ভারসাম্য রক্ষাকারী স্নায়ুর ওপর হয়। একে অ্যাকোস্টিক নিউরোমাও বলা হয়।

৫. মেডুলোব্লাস্টোমা (Medulloblastoma)

এটি একটি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল ক্যানসার টিউমার যা সাধারণত শিশুদের মস্তিষ্কের পেছনের অংশে (Cerebellum) দেখা যায়।


৩. গ্রেড অনুযায়ী ব্রেন টিউমারের পার্থক্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ব্রেন টিউমারকে এর ভয়াবহতা অনুযায়ী ১ থেকে ৪টি গ্রেডে ভাগ করেছে:

  • গ্রেড-১: কোষগুলো দেখতে প্রায় স্বাভাবিকের মতো এবং খুব ধীরে বৃদ্ধি পায়। সার্জারির মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব।
  • গ্রেড-২: এটিও ধীরে বৃদ্ধি পায়, তবে অপারেশনের পর পুনরায় ফিরে আসার বা উচ্চ গ্রেডে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • গ্রেড-৩: এই কোষগুলো ম্যালিগন্যান্ট এবং দ্রুত বিভাজিত হয়। একে ‘অ্যানাপ্লাস্টিক’ টিউমারও বলা হয়।
  • গ্রেড-৪ (Glioblastoma): এটি সবথেকে মারাত্মক এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ব্রেন ক্যানসার। এটি খুব দ্রুত সুস্থ টিস্যুকে আক্রমণ করে।

৪. বিনাইন বনাম ম্যালিগন্যান্ট: পার্থক্য কী?

বৈশিষ্ট্যবিনাইন টিউমার (Benign)ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (Malignant)
ক্যানসারএটি ক্যানসার নয়।এটি ক্যানসারযুক্ত।
বৃদ্ধির গতিঅত্যন্ত ধীর।খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ছড়িয়ে পড়াপাশের টিস্যুতে সাধারণত ছড়ায় না।খুব দ্রুত পাশের সুস্থ কোষে ছড়িয়ে পড়ে।
পুনরায় ফিরে আসাএকবার সফলভাবে ফেলে দিলে সাধারণত আর হয় না।চিকিৎসার পরও ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে।

৫. আধুনিক চিকিৎসায় টিউমার শনাক্তকরণ

বর্তমানে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে অত্যন্ত উন্নত মানের ডায়াগনস্টিক সুবিধা রয়েছে। ব্রেন টিউমারের সঠিক ধরন বুঝতে চিকিৎসকরা সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করান:

  1. Contrast MRI: টিউমারের সঠিক অবস্থান এবং আকার বুঝতে।
  2. CT Scan: হাড়ের গঠন এবং ক্যালসিয়াম জমা হওয়ার পরিমাণ দেখতে।
  3. Biopsy: টিউমার থেকে ছোট এক টুকরো টিস্যু নিয়ে ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা এটি ঠিক কোন প্রকারের টিউমার।
  4. PET Scan: ক্যানসার শরীরের অন্য কোথাও আছে কি না তা নিশ্চিত হতে।

উপসংহার

ব্রেন টিউমার মানেই জীবন শেষ নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রকারভেদের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি (সার্জারি, রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি) প্রচলিত আছে। আপনার বা আপনার পরিচিত কারো যদি দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, বমি ভাব বা দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ নিউরো সার্জনকে দেখান। সঠিক সময়ে শনাক্তকরণই পারে ব্রেন টিউমার পুরোপুরি নিরাময় করতে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *