PLID কি? কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যায়ামসহ সম্পূর্ণ গাইড

PLID কি কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যায়ামসহ সম্পূর্ণ গাইড

বর্তমান সময়ে পিঠ বা কোমরের ব্যথায় ভোগেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করা, সঠিক ভঙ্গিতে না বসা বা ভারী বস্তু তোলার কারণে অনেকেই মেরুদণ্ডের সমস্যায় আক্রান্ত হন। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং জটিল একটি সমস্যা হলো PLID

আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরে কোমরের ব্যথায় ভুগে থাকেন যা পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তবে হতে পারে আপনি PLID-তে আক্রান্ত। আজকের এই বিস্তারিত গাইডে আমরা আলোচনা করব PLID কি, কেন হয়, এর লক্ষণগুলো কি কি এবং এর আধুনিক চিকিৎসা ও ব্যায়াম সম্পর্কে।


১. PLID কি? (What is PLID?)

PLID এর পূর্ণরূপ হলো Prolapsed Lumbar Intervertebral Disc। সহজ বাংলায় একে বলা হয় মেরুদণ্ডের হাড়ের মাঝখানের ডিস্ক সরে যাওয়া।

আমাদের মেরুদণ্ড অনেকগুলো ছোট ছোট হাড় (Vertebra) দিয়ে গঠিত। এই হাড়গুলোর মাঝখানে রাবারের মতো নরম ও স্থিতিস্থাপক একটি অংশ থাকে যাকে বলা হয় Intervertebral Disc। এই ডিস্কগুলো অনেকটা শক অ্যাবজর্বার (Shock Absorber) হিসেবে কাজ করে, যা হাঁটাচলা বা দৌড়ানোর সময় মেরুদণ্ডকে ধাক্কা থেকে রক্ষা করে।

যখন কোনো কারণে এই ডিস্কের ভেতরের জেলির মতো অংশটি (Nucleus Pulposus) বাইরের আবরণ ছিঁড়ে বের হয়ে আসে এবং মেরুদণ্ডের স্নায়ুর (Nerve Root) ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখনই তাকে PLID বলা হয়।


২. PLID কেন হয়? (Causes of PLID)

PLID হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং অনেকগুলো বিষয় এর জন্য দায়ী হতে পারে:

  • বয়সজনিত পরিবর্তন (Ageing): বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিস্কের পানি কমে যায় এবং এটি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ফলে সামান্য আঘাতেই ডিস্ক প্রল্যাপস হতে পারে।
  • ভারী বস্তু তোলা: ভুল পদ্ধতিতে বা হঠাৎ করে খুব ভারী কিছু তুললে ডিস্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে এবং তা ফেটে যেতে পারে।
  • অস্বাভাবিক শারীরিক ভঙ্গি (Bad Posture): দীর্ঘক্ষণ কুঁজো হয়ে বসে কাজ করা বা ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানোর ফলে মেরুদণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
  • আঘাত পাওয়া: খেলাধুলা বা দুর্ঘটনার সময় সরাসরি মেরুদণ্ডে আঘাত লাগলে PLID হতে পারে।
  • অতিরিক্ত ওজন (Obesity): শরীরের ওজন বেশি হলে তা বহন করার জন্য মেরুদণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
  • ধূমপান: ধূমপান ডিস্কে পুষ্টি সরবরাহ কমিয়ে দেয়, ফলে ডিস্ক দ্রুত শুকিয়ে যায়।
  • বংশগত কারণ: অনেকের ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবেই মেরুদণ্ডের গঠন দুর্বল থাকে।

৩. PLID এর লক্ষণসমূহ (Symptoms of PLID)

PLID-র লক্ষণগুলো নির্ভর করে মেরুদণ্ডের কোন অংশে ডিস্ক সরে গেছে এবং তা কতটা স্নায়ুর ওপর চাপ দিচ্ছে তার ওপর। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  1. তীব্র কোমর ব্যথা: যা কোমরের মাঝখানে বা একপাশে হতে পারে।
  2. সায়াটিকা (Sciatica): ব্যথা কোমর থেকে শুরু করে উরু হয়ে পায়ের তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া।
  3. ঝিনঝিন বা অবশ ভাব: আক্রান্ত পায়ে ঝিনঝিন করা, অবশ অবশ লাগা বা জ্বালাপোড়া করা।
  4. পেশির দুর্বলতা: পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া, যার ফলে হাঁটতে বা সিঁড়ি বাইতে কষ্ট হওয়া।
  5. হাঁচি বা কাশিতে ব্যথা বৃদ্ধি: হাঁচি দিলে, কাশলে বা সামনের দিকে ঝুঁকলে ব্যথার তীব্রতা বেড়ে যাওয়া।
  6. মলমূত্র ত্যাগে সমস্যা: এটি PLID-র একটি অত্যন্ত জটিল লক্ষণ। যদি ব্যথা তীব্র হওয়ার পাশাপাশি প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, তবে একে ‘কডা ইকুইনা সিনড্রোম’ বলা হয়, যা একটি ইমার্জেন্সি।

৪. PLID নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Diagnosis)

সঠিক চিকিৎসা শুরু করার আগে রোগটি কতটা জটিল তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। চিকিৎসকরা সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো দিয়ে থাকেন:

  • শারীরিক পরীক্ষা (Physical Exam): চিকিৎসক রোগীর পা তুলে ব্যথার তীব্রতা এবং স্নায়ুর সাড়া পরীক্ষা করেন (SLR Test)।
  • MRI (Magnetic Resonance Imaging): PLID নির্ণয়ের জন্য সবথেকে কার্যকর পরীক্ষা। এর মাধ্যমে ডিস্কের অবস্থান এবং স্নায়ুর ওপর চাপের পরিমাণ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
  • X-ray: হাড়ের কোনো ভাঙন বা বিচ্যুতি আছে কি না তা দেখতে এটি করা হয়। তবে ডিস্ক প্রল্যাপস সাধারণ এক্স-রেতে ধরা পড়ে না।
  • EMG ও Nerve Conduction Study: স্নায়ুর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ ঠিক আছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়।

৫. PLID এর চিকিৎসা (Treatment Options)

অনেকের ধারণা PLID মানেই অপারেশন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রায় ৯০-৯৫% রোগী সঠিক বিশ্রাম, ওষুধ এবং ফিজিওথেরাপি বা ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ক. কনজারভেটিভ চিকিৎসা (নন-সার্জিক্যাল)

  • পূর্ণ বিশ্রাম: তীব্র ব্যথার সময় ২-৩ দিন শক্ত বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী বিশ্রাম পেশিকে দুর্বল করে দেয়।
  • ওষুধ: ব্যথানাশক ওষুধ (NSAIDs), পেশি শিথিলকারক (Muscle Relaxants) এবং নার্ভের পুষ্টির জন্য ভিটামিন-বি জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়।
  • ফিজিওথেরাপি: একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে শর্ট ওয়েভ ডায়াথার্মি (SWD), আল্ট্রাসাউন্ড বা ট্র্যাকশন থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর।

খ. ইনজেকশন থেরাপি

যদি ওষুধে কাজ না হয়, তবে মেরুদণ্ডের এপিডিউরাল স্পেসে স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়া হতে পারে, যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

গ. সার্জারি বা অপারেশন

নিচের ক্ষেত্রগুলোতে অপারেশনের প্রয়োজন হয়:

  • যদি ২-৩ মাস চিকিৎসার পরেও ব্যথা না কমে।
  • যদি পা শুকিয়ে যেতে থাকে বা স্নায়ুর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়।
  • মলমূত্র ত্যাগের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেলে (জরুরি অপারেশন)। আধুনিক চিকিৎসায় মাইক্রো-ডিসকেক্টোমি (Microdiscectomy) বা লেজার সার্জারির মাধ্যমে খুব ছোট ছিদ্র করে অপারেশন করা হয়।

৬. PLID-র জন্য বিশেষ ব্যায়াম ও নিয়মাবলী

ব্যায়াম PLID রোগীদের জন্য সবথেকে বড় ওষুধ। তবে ব্যথা যখন তীব্র থাকে তখন ব্যায়াম করা নিষেধ। ব্যথা কিছুটা কমলে নিচের ব্যায়ামগুলো করা যেতে পারে:

উপকারী ব্যায়াম (Physiotherapy Exercises)

  1. McKenzie Extension: উপুড় হয়ে শুয়ে দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে বুক ওপরের দিকে তোলা।
  2. Bridge Exercise: চিৎ হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু ভাঁজ করে কোমর ওপরের দিকে তোলা।
  3. Pelvic Tilt: পিঠের নিচ অংশকে মেঝের সাথে চেপে ধরে রাখা।

সতর্কতা: ব্যথার ধরন অনুযায়ী একেকজনের ব্যায়াম একেক রকম হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ব্যায়াম শুরু করবেন না।

মেনে চলার নিয়ম:

  • কখনও নিচু হয়ে ঝুঁকে কাজ করবেন না। কোনো কিছু নিচে পড়লে হাঁটু ভাঁজ করে বসে তুলুন।
  • শক্ত সমান বিছানায় ঘুমাবেন। খুব নরম গদি ব্যবহার করবেন না।
  • দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে বসে থাকবেন না। প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর একটু হাঁটাহাঁটি করুন।
  • ভারী বালতি বা ব্যাগ বহন করবেন না।
  • সিঁড়ি বাইতে হলে ধীরে ধীরে হাতল ধরে উঠবেন।

৭. উপসংহার

PLID কোনো আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতার মাধ্যমে একে জয় করা সম্ভব। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে অপারেশন ছাড়াই সুস্থ থাকা যায়। আপনার যদি দীর্ঘদিনের কোমর ব্যথা থাকে, তবে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আপনি কি মেরুদণ্ডের ব্যথার জন্য ফিজিওথেরাপি বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান? আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন!

3 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *