হাত পা অবশ হলে কোন ডাক্তার দেখাতে হবে – একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা

হাত পা অবশ হলে কোন ডাক্তার দেখাতে হবে

হাত-পা অবশ হওয়া বা অসাড়তা (Numbness) মূলত শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যুক্ত। যখন কোনো কারণে আমাদের শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশের রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয় বা স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে, তখনই সেই অংশটি অবশ অনুভূত হয়।

১. হাত পা অবশ হলে কোন ডাক্তার দেখাবেন?

হাত-পা অবশ হওয়ার চিকিৎসা মূলত সমস্যার কারণের ওপর নির্ভর করে। তবে প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশেষজ্ঞ পর্যায় পর্যন্ত আপনি নিচের চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে পারেন:

  • নিউরোলজিস্ট (Neurologist): হাত-পা অবশ হওয়া মূলত স্নায়বিক সমস্যা। তাই একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞই হলেন এই সমস্যার প্রধান ডাক্তার। আপনার যদি নিয়মিত হাত-পা অবশ হয়, তবে দ্রুত নিউরোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
  • মেডিসিন বিশেষজ্ঞ (Medicine Specialist): যদি প্রাথমিক অবস্থায় আপনি বুঝতে না পারেন কেন এমন হচ্ছে, তবে একজন জেনারেল ফিজিশিয়ান বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে দেখাতে পারেন। তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন এটি ডায়াবেটিস বা ভিটামিনের অভাবজনিত কারণে হচ্ছে কি না।
  • ফিজিওথেরাপিস্ট (Physiotherapist): অনেক সময় হাড়ের সমস্যা বা ভুল ভঙ্গিতে বসার কারণে নার্ভে চাপ পড়ে হাত-পা অবশ হয়। সেক্ষেত্রে নিউরোলজিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর।
  • ডায়াবেটোলজিস্ট (Diabetologist): আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে এবং এর ফলে হাত-পা অবশ হয় (যাকে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বলা হয়), তবে একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

২. হাত-পা অবশ হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

কেন হাত-পা অবশ হয়, তা জানা থাকলে সঠিক ডাক্তার নির্বাচন করা সহজ হয়। প্রধান কারণগুলো হলো:

কারণবিবরণ
স্নায়ুতে চাপ (Nerve Compression)দীর্ঘক্ষণ একভাবে বসে থাকা বা শোয়ার ফলে নার্ভে চাপ পড়লে সাময়িক অবশ ভাব হয়।
ভিটামিনের অভাববিশেষ করে ভিটামিন B1, B6, এবং B12 এর অভাবে হাত-পা ঝিঁঝিঁ ধরে।
ডায়াবেটিসরক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীরের প্রান্তীয় স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সার্ভাইকাল স্পন্ডিলোসিসঘাড়ের হাড়ের সমস্যার কারণে হাতের আঙুল বা পুরো হাত অবশ হতে পারে।
কারপাল টানেল সিনড্রোমকব্জির স্নায়ুতে চাপের ফলে হাতের তালু ও আঙুল অবশ হয়ে যায়।
রক্ত সঞ্চালনে বাধাশরীরের কোনো অংশে রক্ত ঠিকমতো পৌঁছাতে না পারলে সেই জায়গাটি ঠান্ডা ও অবশ হয়ে যায়।

৩. কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি?

সব অবশ হওয়া সাধারণ নয়। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে জরুরি বিভাগে বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান:

  • হঠাৎ করে শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া (এটি স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে)।
  • কথা বলতে সমস্যা হওয়া বা মুখ বেঁকে যাওয়া।
  • তীব্র মাথা ব্যথার সাথে হাত-পা অবশ হওয়া।
  • আঘাত পাওয়ার পর অবশ ভাব শুরু হওয়া।
  • নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মল-মূত্র ত্যাগ হওয়া।

৪. রোগ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাসমূহ

ডাক্তার আপনার শারীরিক অবস্থা বুঝে কিছু পরীক্ষা দিতে পারেন:

  1. Nerve Conduction Study (NCS): স্নায়ুর কার্যক্ষমতা দেখার জন্য।
  2. Electromyography (EMG): পেশি এবং স্নায়ুর সংযোগ পরীক্ষার জন্য।
  3. MRI বা CT Scan: মেরুদণ্ড বা মস্তিষ্কের কোনো সমস্যা আছে কি না তা দেখতে।
  4. রক্ত পরীক্ষা: ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা ভিটামিনের মাত্রা চেক করতে।

৫. ঘরোয়া কিছু সমাধান ও সচেতনতা

চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব:

  • সুষম খাবার: ভিটামিন বি সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: দুধ, ডিম, কলিজা, সবুজ শাকসবজি) ডায়েটে রাখুন।
  • বসার ভঙ্গি: দীর্ঘক্ষণ এক টানা বসে না থেকে মাঝে মাঝে হাঁটাহাঁটি করুন।
  • ব্যায়াম: নিয়মিত যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করলে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।
  • ধূমপান ত্যাগ: ধূমপান রক্তনালীকে সংকুচিত করে, যা অবশ হওয়ার প্রবণতা বাড়ায়।

উপসংহার

হাত-পা অবশ হওয়াকে অবহেলা করবেন না। এটি সাময়িক ক্লান্তি হতে পারে, আবার হতে পারে কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগের সংকেত। সঠিক সময়ে একজন নিউরোলজিস্ট দেখালে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *