মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ার পর সবথেকে বড় আতঙ্ক এবং কৌতূহল তৈরি হয় এর অস্ত্রোপচার বা অপারেশন নিয়ে। মস্তিষ্ক যেহেতু শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ, তাই এই অপারেশনটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় নিউরোসার্জারি (Neurosurgery)।
অনেকেই মনে করেন ব্রেন অপারেশন মানেই অনেক ঝুঁকি। কিন্তু বর্তমানে নিউরোনভিগেশন, অপারেটিভ মাইক্রোস্কোপ এবং এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতির কল্যাণে এই অপারেশন এখন অনেক বেশি নিরাপদ এবং সফল। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব ব্রেন টিউমার অপারেশন কীভাবে করা হয় এবং এর ধাপগুলো কী কী।
১. অপারেশনের আগের প্রস্তুতি (Pre-operative Phase)
অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে একজন নিউরো সার্জন রোগীকে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করেন।
- ডায়াগনস্টিক ম্যাপ: সিটি স্ক্যান (CT Scan) এবং কনট্রাস্ট এমআরআই (MRI) এর মাধ্যমে টিউমারের সঠিক অবস্থান, আকার এবং এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালীর সাথে যুক্ত কি না তা নিশ্চিত করা হয়।
- রুটিন চেকআপ: রোগীর রক্তচাপ, সুগার এবং হার্টের অবস্থা পরীক্ষা করা হয়।
- অ্যানেশেসিয়া অ্যাসেসমেন্ট: রোগীকে পূর্ণ অজ্ঞান (General Anesthesia) করার জন্য ফিটনেস চেক করা হয়।
২. ব্রেন টিউমার অপারেশনের প্রধান ধাপসমূহ
একটি সাধারণ ব্রেন টিউমার অপারেশন (যেমন: Craniotomy) সাধারণত নিচের ধাপগুলোতে সম্পন্ন হয়:
ধাপ ১: অ্যানেশেসিয়া এবং পজিশনিং
প্রথমে রোগীকে অজ্ঞান করা হয় যাতে তিনি কোনো ব্যথা অনুভব না করেন। এরপর টিউমারের অবস্থান অনুযায়ী রোগীকে একটি বিশেষ টেবিলে নির্দিষ্ট পজিশনে শোয়ানো হয়। মাথার নড়াচড়া বন্ধ করতে একটি ‘স্কাল পিন’ বা ফ্রেম ব্যবহার করা হতে পারে।
ধাপ ২: স্ক্যাল্প ইনসিশন (মাথা কাটা)
যে স্থানে টিউমার রয়েছে, তার ঠিক ওপরের মাথার ত্বকে একটি সুনির্দিষ্ট কাট বা ইনসিশন দেওয়া হয়। বর্তমানে মাইক্রো-সার্জারির যুগে খুব বড় করে মাথা কাটার প্রয়োজন হয় না।
ধাপ ৩: ক্র্যানিওটমি (খুলি খোলা)
এটি অপারেশনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি বিশেষ ড্রিল এবং করাত (Craniotome) ব্যবহার করে মাথার খুলির একটি নির্দিষ্ট অংশ গোল করে বা চারকোণা করে কেটে আলাদা করা হয়। এই অংশটি অপারেশনের পর আবার লাগিয়ে দেওয়া হয়।
ধাপ ৪: ডুরাম্যাটার খোলা
মস্তিষ্কের ওপরে একটি শক্ত সুরক্ষা আবরণ থাকে যাকে বলা হয় Dura Mater। সার্জন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এটি কেটে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সরাসরি মস্তিষ্কের টিস্যু দেখতে পান।
ধাপ ৫: টিউমার অপসারণ (Tumor Removal)
এখানেই আধুনিক প্রযুক্তির মূল কাজ। সার্জন অপারেটিভ মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে সুস্থ টিস্যু থেকে টিউমারকে আলাদা করেন।
- CUSA (Ultrasonic Aspirator): এই যন্ত্রটি আল্ট্রাসনিক কম্পনের মাধ্যমে শক্ত টিউমারকে তরল করে টেনে বের করে নিয়ে আসে।
- নিউরোনভিগেশন: এটি সার্জারির সময় জিপিএস-এর মতো কাজ করে, যা সার্জনকে বলে দেয় টিউমারের শেষ সীমানা কোথায়।
ধাপ ৬: বন্ধ করা (Closure)
টিউমার অপসারণ শেষে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়। এরপর ডুরাম্যাটার সেলাই করা হয় এবং খুলির সেই অংশটি পুনরায় বসিয়ে ছোট ছোট স্ক্রু বা প্লেট দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। সবশেষে চামড়া সেলাই বা স্ট্যাপল করে ব্যান্ডেজ দেওয়া হয়।
৩. অপারেশনের আধুনিক পদ্ধতিসমূহ
সব টিউমারের জন্য মাথা কাটার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক কিছু পদ্ধতি হলো:
- এন্ডোস্কোপিক সার্জারি: টিউমার যদি মস্তিষ্কের গভীরে বা পিটুইটারি গ্রন্থিতে থাকে, তবে নাক দিয়ে বা খুব ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা (Endoscope) ঢুকিয়ে টিউমার বের করা হয়।
- অ্যাওয়েক ক্র্যানিওটমি (Awake Surgery): টিউমার যদি কথা বলা বা নড়াচড়ার কেন্দ্রের খুব কাছে থাকে, তবে রোগীকে অপারেশনের মাঝে জাগিয়ে রাখা হয় এবং কথা বলতে বলা হয় যাতে কোনো নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
- গামা নাইফ (Stereotactic Radiosurgery): এটি কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই কেবল রশ্মির মাধ্যমে টিউমার ধ্বংস করে।
৪. অপারেশনের পর রিকভারি (Recovery)
- আইসিইউ (ICU): অপারেশনের পর সাধারণত ২৪ ঘণ্টা রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
- সচেতনতা পরীক্ষা: রোগী জ্ঞান ফেরার পর তাকে সহজ কিছু প্রশ্ন করা হয় এবং হাত-পা নাড়াতে বলা হয়।
- হাসপাতাল ত্যাগ: জটিলতা না থাকলে ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে রোগী বাড়ি ফিরতে পারেন।
- সেলাই কাটা: সাধারণত ১০-১৪ দিন পর সেলাই কাটা হয়।
৫. অপারেশনের ঝুঁকি ও বাস্তবতা
যেকোনো বড় সার্জারির মতো এতেও কিছু ঝুঁকি থাকে, যেমন: ইনফেকশন, রক্তক্ষরণ বা সাময়িক স্মৃতিবিভ্রম। তবে বিশেষজ্ঞ নিউরো সার্জনের অধীনে আধুনিক প্রযুক্তিতে অপারেশনের সাফল্যের হার বর্তমানে ৯৫% এরও বেশি। ভুল ধারণা বা পঙ্গু হওয়ার ভয়ে অপারেশন পিছিয়ে দিলে টিউমার বড় হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।
উপসংহার
ব্রেন টিউমার অপারেশন বর্তমানে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি। সঠিক সময়ে অপারেশন করলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে আসতে পারেন। ভয় না পেয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পদ্ধতিটি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন।

